থ্যাঙ্কসগিভিং

থ্যাঙ্কসগিভিং এর ঐতিহ্যবাহী খাবার ( গুগলের সৌজন্যে )

১.                                                                                                                                             থ্যাঙ্কসগিভিং এর বেশ কিছুদিন আগে থেকেই আমেরিকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।দেখতে বেশ ভালই লাগে।আম্রিকানদের দেখলে মনে হয় ঈদ আসছে… ওদের ভেতর অন্যরকম এক উত্তেজনা দেখা যায়। সাধারণত এই ধরনের আনন্দ আমরা ঈদে করি।প্রতি বছর নভেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবাররে পালন করা হয় এই থ্যাঙ্কসগিভিং।এটাই আমেরিকার সব চেয়ে বড় পারিবারিক উৎসব,এমনকি বড়দিন এর থেকেও বড়।এই উৎসব উপলক্ষে পরিবারের সবাই একসাথে হয়।আর সবাই কিছু না কিছু খাবার নিয়ে আসে।শুক্রবার সন্ধ্যায়  পরিবারের সকলের সাথে ডিনার করাটা প্রায় সব বাড়িতেই রীতি,যা নববর্ষ কিংবা বড়দিনে দেখা যায় না।বড়দিন থেকে নববর্ষ পর্যন্ত আমেরিকানরা অবশ্য নিজেদের নিয়েই ব্যাস্ত থাকে। থ্যাঙ্কসগিভিং এ আমেরিকান ফুটবল খেলাও দেখানো হয়, যা পরিবারের সবাই মিলে একত্রে বসে দেখে- এটাও এই উৎসবের ঐতিহ্যের একটা অংশ।

২.                                                                                                                                                       টুলেইন ইউনিভার্সিটি এবারও আন্তজার্তিক ছাত্রদের জন্য ডিনার আয়োজন করেছিল।থ্যাঙ্কসগিভিং এর ঐতিহ্যবাহী খাবার- টার্কি।সঙ্গে মিষ্টিআলুর ভর্তা,সাদা ভাত,পাস্তা,সালাদ আরো অনেক কিছু।সেই সাথে ডেজার্ট হিসেবে মিষ্টিকুমড়ার পাই,ক্র্যানবেরীর জেলী (দেখতে আমদের দেশের সাধারন জেলীর মত কিন্তু স্বাদ অখাদ্য) 😦 ।       ডিনারের শুরু হয় ছোটখাট প্রার্থনা দিয়ে… যদিও সেই দিকে কারো নজর থাকে না।সবার চোখ খাবার টেবিলের দিকেই বেশি থাকে, 🙂 ।

৩.                                                                                                                                                          আমাদের দেশে যেমন অগ্রাহায়ণ মাসে ধান কাটার মধ্য থেকে নবান্নের সূচনা হয়,তেমনি ওদেরও ফসল ঘরে তোলার পর থেকেই এই উৎসবের শুরু হতো।থ্যাঙ্কসগিভিংকে প্রাথমিক ভাবে শষ্য উৎসব ধরা হতো। আদিবাসী আমেরিকানরা এক সময় বেশ বড় করেই এই উৎসব পালন করতো।এই উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে তারা প্রকৃতিকে ধন্যবাদ জানাতো। আর এটাই ছিল আদিবাসীদের থ্যাঙ্কসগিভিং।মূলত থ্যাঙ্কসগিভিংটা হলো ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয়ার প্রথা।মুসলিম সমাজে এই থ্যাঙ্কসগিভিংকে ঈদ-উল-আয্‌হা এর সাথে তুলনা করা যায়।তবে বর্তমানে এই থ্যাঙ্কসগিভিং এ আধুনিক সংষ্কৃতি মিশেলে হয়ে গেছে পারিবারিক মিলনমেলা।যদিও ভাবার্থ একই- ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা… পরিবারের সকলকে একত্রিত করার জন্য।

১৬১৯সালের শেষের দিকে ইউরোপীয়ান অভিবাসীরা যখন এদেশে আসে তখন তারা নতুন পরিবেশের সাথে একদমই খাপ খাওয়াতে পারছিলো না।অভিবাসীরা চাষাবাদ শুরু করেছিল,কিন্তু নতুন জায়গায়,নতুন আবহাওয়ায় কিভাবে ফসল ফলাতে হবে, তা না জানার কারনে তাদের ফলন হয়নি।তার উপর নতুন করে দেখা দিয়েছিল সম্পুর্ণ অজানা কিছু রোগ।সব মিলিয়ে তাদের অবস্থা যখন খুবই খারাপ তখন তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে ওই এলাকার আদিবাসীরা।আদিবাসীদের সাহায্যেই তারা পূনরায় জীবন লাভ করে।আদিবাসীরাই তাদের শেখায় কিভাবে চাষাবাদ করতে হবে,কিভাবে রোগ এর প্রতিকার বা প্রতিরোধ সম্ভব। এভাবেই ইউরোপীয়ান অভিবাসীরা আবার নিজের পায়ে দাঁড়ায়। ১৬২১ সালে অভিবাসীদের যখন ফলন অনেক ভাল হয় তখন ভার্জিনিয়ার প্লীমাথ প্ল্যাণ্টেশনে প্রথম বড় করে থ্যাঙ্কসগিভিংয়ের ভোজের আয়োজন করে ইউরোপীয়ান অভিবাসীরা। দাওয়াত দেয়া হয় আদিবাসীদের।আদিবাসীরাও এই দাওয়াতে যায় হরিণের মাংশ,টার্কি ও কিছু ফলমূল নিয়ে। হয়তো এখান থেকেই এসেছে পরিবারের জন্য খাবার তৈরি করে নিয়ে যাবার প্রথা।আমেরিকার ইতিহাসে এটিই হলো প্রথম ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’ ।

কিন্তু আদিবাসীরা বলে ভিন্ন কথা। আমেরিকার অনেক আদিবাসীরাও থ্যাঙ্কসগিভিং পালন করে।তবে সেটা ধন্যবাদ জ্ঞাপন দিবস হিসেবে না, শোক দিবস হিসেবে। কারন অভিবাসীদের উদার বক্ষে আমন্ত্রণ জানানোর পরও অভিবাসীরা তাদের দিয়েছে দাসত্ব, নির্মম মৃত্যু এবং নিজ গোত্রের বিলুপ্তি।এই দিন ওদের মনে করিয়ে দেয় প্রায় চারশ বছরের নির্মম স্মৃতি ।কিং ফিলিপের যুদ্ধ নামের যুদ্ধে আমেরিকার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের সকল আদিবাসীদের নির্মূল করা হয়।সে সময়ের ইউরোপীয়ান কলোনীর ইতিহাস বলে- অভিবাসীরা এমন যুদ্ধে জেতার পর  নাকি বড় ভোজের আয়জন করতো,আর সেগুলোর নাম দিত – ‘থ্যাঙ্কসগিভিং’ …. এখানেও কিন্তু মূল ভাব একই- ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেয়া…. তবে তা যুদ্ধে জেতার জন্য।

১৯৪১সালে প্রেসিডেন্ট রুজভল্ট থ্যাঙ্কসগিভিংকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে ঘোষনা করেন।

Advertisements
This entry was posted in সংষ্কৃতি. Bookmark the permalink.

12 Responses to থ্যাঙ্কসগিভিং

  1. অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমি সেদিন প্রথম আমার এক আমেরিকা প্রবাসী বন্ধুকে ফেইসবুকে হ্যাপী থ্যাঙ্কসগিভিং লেখা শেয়ার করতে দেখে ভেবেছিলাম, এটা মনে হয় বড়দিনের আগের মাসে (কাকতালীয়ভাবে ২৫ নভেম্বর) আরেকটা খ্রীস্টিয় উৎসব।

    খুব ভালো লাগল। তবে শেষের দিকে এসে কিছুটা খারাপ লেগেছে আদিবাসীদের কথা ভেবে। শুভেচ্ছা 🙂

  2. তৌফিক হাসান বলেছেন:

    লেখা ভাল হইসে।
    অনেক গোছানো মনে হইল। অভিনন্দন।
    চলুক।

  3. maq বলেছেন:

    ইউরোপে থাকার বদৌলতে ‘থ্যাঙ্কস গিভিং’ এর মর্মার্থ বা আমেজ কখনো টের পাইনি। এটা শুধুই আমেরিকা-কেন্দ্রীক (কানাডায় হয় কিনা জানা নেই)!

    তথ্যগুলো গুছিয়ে লেখার জন্য বড়সড় “থ্যাঙ্কস”! 🙂

    • রাহাত-ই-আফজা বলেছেন:

      তানিম ভাই কানাডাতেও থ্যাঙ্কসগিভিং হয়- অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবার।
      আপনাকেও ধন্যবাদ ব্লগে আসার জন্য। 🙂

      • maq বলেছেন:

        বাহ আপনি দেখি সবার কমেন্টের উত্তর দেন! আমি আমার ব্লগে লোকজনের মন্তব্যের যে কি রিপ্লাই দিব সেটাই বুঝিনা! 😛 সেজন্য সেভাবে খুব একটা জবাব দেয়া হয়না… 🙂

  4. হিমেল বলেছেন:

    maq ভাইয়া বলেছেন।
    আমেরিকা ও ইউরোপের উৎসবের মধ্যে অনেক পাথর্ক্য আমি এ উৎসব কথা কখনো শুনিনি।
    লেখাটি খুবই গোছানো হয়েছে।

  5. Rony Parvej বলেছেন:

    আজই প্রথম শুনলাম এই উৎসবের কথা। ভালোই তো। 😀

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s