বন্ধুত্ব, প্রেম এবং যুদ্ধ- ১

বন্ধুতা

অনার্সে যখন হোম ইকোনোমিক্স কলেজে ভর্তি হলাম তখন কেউই পরিচিত ছিল না। তাই ভর্তির দিন হেলেদুলে কলেজে উপস্থিত হলাম। কারন যেহেতু পরিচিত কেউই নাই যেকোন জনের আগে পিছে ভর্তি হলেই হলো। আমার সামনে পিছনে যারা ভর্তি হয়েছিল তাদের মোবাইল নং নিয়ে বাসায় ফিরলাম। ওরা দুইজনই ছিল বগুরার। দুজনেই খুব ভাল। ওদের সাথে আমার খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল মোবাইলেই। ভর্তির ১মাস পরে আমাদের ক্লাস শুরু হলো।

ক্লাস শুরু হবার পরপরই আমাদের বলা হলো ক্লাসের মেয়েদের মধ্যে ২জন ক্লাস প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য যারা সরাসরি শিক্ষকদের সাথে যোগাযোগ করতে পারবে। আমার বন্ধুরা আমাকে ঠেলে দাড় করিয়ে দিল যে আমি ১জন ক্লাস প্রতিনিধি হতে আগ্রহী। কিছুক্ষন পর দেখি আরো একজন মেয়ে দাড়ালো। আর কেউ দাড়াচ্ছে না দেখে ম্যাডাম আমাদের ক্লাস প্রতিনিধি নির্বাচন করে আমাদের নাম, রোল, মোবাইল নং নিয়ে ক্লাস থেকে চলে গেলেন। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই ক্লাস ক্যাপ্টেন হয়ে গেলাম। স্কুলে মনে হয় প্রাইমারীতে যতদিন ছিলাম ততদিন ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিলাম।তারপর অনার্সে ক্যাপ্টেন হলাম।টানা চার বছর ক্যাপ্টেন পদে ছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা অন্যরকম ছিল। 🙂

যাই হোক স্কুলের ক্যাপ্টেন আর অনার্স লেভেলের মধ্যে খুব ১টা তফাৎ ছিল না। মেয়েদের কিছু কমন দাবী ছিল যেমন- প্রেজেন্ট শীট যেহেতু আমার হাতের উপর দিয়ে যায় সেহেতু তাদের প্রেজেন্ট দিয়ে দেয়া আর ক্লাস না করার পেছনে সবারই মোটামুটি কারন ১টাই-  ডেটিং। আর ডেটিং এর কথা বললে কাউকে তো আর মুখের উপর না করা যায় না। আমিও কম বেশি তাদের উপকারে আসতাম। এভাবেই করে ক্লাসে যাদের এফ্যেয়ার চলে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক বেশ ভাল হয়ে গেল। আমি তাদের মাঝে মাঝে বাসায় ট্যাকেল দেবার কিছু উপায়ও বলে দিতাম। যেমন বাসায় ফিরতে দেরি হলে আব্বু আম্মুকে কি বলতে হবে, বাসায় ধরা পরে যাওয়ার পর বাসা থেকে মোবাইল সিজ করলে সেই সিজ করা মোবাইল উদ্ধারের উপায় ইত্যাদি ইত্যাদি। 😀

এভাবেই আমার পরিচয় জিসান( আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু) এর সাথে। ও বেচারার বাসা থেকে মোবাইল কিনে দেবার এক মাসের মধ্যেই বাসা থেকে ওর মোবাইল সিজ করে। কারন হলো বেচারা কথা বলতেসিল ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে,তখন ওর বোন জিজ্ঞাসা করসে কার সাথে কথা বলিস?ও সত্যবান, সত্য কথা বলে খাইসে ধরা।তারপর আমি বুদ্ধি দিলাম কিভাবে মোবাইল উদ্ধার করা যায়। কিন্তু সেই প্রথম আমার বুদ্ধি কাজ করলো না । তারপর আমিও মরিয়া হয়ে গেলাম আমার রেপুটেশন বজায় রাখতে। ওর বাসায় বেশ কয়েকবার ফোন দেবার পর জিসান  তার মোবাইল ফেরত পায়। এভাবেই আমি আর জিসান বেশ ভাল বন্ধু হয়ে গেলাম। আমার পাংখামী ওর ভাল লাগতো আর ওর সততা আমার ভাল লাগতো। ঘটনার শুরু এখান থেকেই। 😉

জিসান এর সাথে তানিনের ফ্রেন্ডশিপ কলেজের প্রথম দিন থেকেই। ওরা দুইজন একসাথে বসে, এক সাথে ঘুরে,এক সাথে ডেটিং এ যায়। কারন জিসানের স্কুলের বেষ্ট ফ্রেন্ডের সাথে তানিনের এফ্যেয়ার হয়ে গিয়েছিল।আর জিসানের এফ্যেয়ার ক্লাস এইট থেকে।ওরা দুজনই ক্লাসমেট ছিল।এফ্যেয়ারের জন্য জিসানকে ইন্টারে পুরা ৮মাস বাসায় বন্দী করে রাখা হয়। এভাবেই জিসান- ডলার ক্লাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাপল হয়ে যায়। আর তানিন- তুর্য (জিসান আর ডলারের বেষ্ট ফ্রেণ্ড) কাপল হয়ে যায়।

ক্লাসে দেখা গেল জিসান আমার সাথে থাকতে বেশি পছন্দ করতো আর আমি ওর সাথে। এমন চলতে চলতেই ফাস্ট ইয়ার শেষ হয়ে গেল। ফাস্ট ইয়ার ফাইনালের পর আমরা অনেক দিন বন্ধ পেয়েছিলাম। তখন আমি আর জিসান রেগুলার কলেজ যেতাম।আমাদের ফ্রেন্ডশিপ আরো দৃঢ় হলো। সেই সময় তানিন ঢাকায় ছিল না। ও গিয়েছিল ওর দেশের বাড়ীতে। ডলারের সাথেও আমার বেশ ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

সেকেন্ড ইয়ারের ক্লাস শুরু হলো তানিনও বাসা থেকে ফেরত আসলো। কিন্তু দেখা গেল জিসান আর আমি এখন সব চেয়ে বেশি ক্লোজ। ক্লাসে জিসান আর আমি এক সাথে বসি, এক সাথে টিচার্স রুমে যাই, এক সাথে ক্যান্টিনে খাই। জিসান আমার পছন্দ মত খাওয়া অর্ডার করে আমি জিসানের পছন্দের খাওয়া অর্ডার করি। স্বাভাবিক ভাবেই তানিনের খারাপ লাগতে শুরু করলো। বিনা কারনে আমার সাথে তানিনের ঝামেলা শুরু হলো। আমি ক্লাসে মেয়েদের কাছে কোন প্রস্তাব করলেই সবার প্রথমে তার বিপক্ষে যেত তানিন। আর এমনটায় জিসানের মেজাজ সব চেয়ে বেশি খারাপ হতো। এভাবে জিসান আর তানিনের মধ্যে ঝামেলা বাড়তে লাগলো। স্বাভাবিকভাবেই দূরত্বও বাড়তে লাগলো।

আমার আর তানিনের মধ্যে পড়ালেখা থেকে শুরু করে সব দিক থেকেই কম্পিটিশন শুরু হলো।যদিও তানিন আমার থেকে অনেক ভাল ছাত্রী ছিল কিন্তু আমি কখনই সেটা মানি নাই।তানিনের সব কিছু আমার আর আমার সব কিছু তানিনের খারাপ লাগতে শুরু হলো। আর জিসানের দৃষ্টিতে আমি এমন একজন মানুষ ছিলাম যে আমার সব কিছুই জিসান ঠিক মনে করতো। তানিন যখনই জিসানকে আমার বিপরীতে কিছু বলতো তখনই জিসান আর তানিনের ঝগড়া হতো। আর সেটা আমি উপভোগ করতাম।জানি না কেন তানিন আর জিসানের মধ্যে কোন ঝামেলা হলে সব চেয়ে বেশি খুশি হতাম আমি। কেমন যেন একটা পৈশাচিক আনন্দ হতো। আমি জিসানকে বলতাম তোর তানিনের সাথে ফ্রেন্ডশিপ রাখারই কি দরকার যদি তোদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং এ কোন সমস্যা থাকে। কিন্তু জিসানের কথা ছিল তানিন ওর অনার্সের সব চেয়ে প্রথম বন্ধু,তাই জিসান তানিনের বন্ধুত্ব ভাঙ্গতে পারবে না। তাই আমি আর কিছু বলতাম না।

আমার আর তানিনের সম্পর্ক প্রতিনিয়ত খারাপ হতে থাকলো। আমাদের ক্লাসের আরেক ক্যাপ্টেন পাপড়ীর সাথেও আমার বন্ধুত্ব খুবই ভাল ছিল। দেখা গেল আমার সম্পর্কে সমস্ত অভিযোগ তানিন পাপড়ীকে করতেসে। পুরাই একটা ঘোলাটে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে গেল। কারন পাপড়ী আমাকে সবই বলতো আর আমি জিসানকে সব জানাতাম।এক পর্যায়ে এই নিয়ে তানিন আর জিসানের মধ্যে খুব বড় ঝগড়া হল। এভাবেই আমাদের সেকেন্ড ইয়ার ফাইনাল শেষ হলো। তানিনেরও বাড়ী যাবার সময় চলে আসলো, এতে জিসানও খুশি আমিও খুশি। কিন্তু তানিন এবার সরাসরি বাড়ী গেল না। তানিন কিছুদিনের জন্য জিসানের বাসায় উঠলো। সেখান থেকে তানিন প্রতিদিন আমকে ফোন দিত আর বলতো আজ ওরা এখানে গিয়েছে,কাল এত মজা করেছে। শুনে আমারও খারপ লাগতো। কিন্তু আমার বাসা এমন না যে আমি গিয়ে বন্ধুদের বাসায় ১/২দিন থাকতে পারব। আব্বু কখনই রাজী হবে না।আমার কিছু করার থাকল না। কিন্তু জিসান আমার সাথে প্রতিদিন ফোন দিয়ে ১ঘন্টার মত কথা বলতো। এটা তানিনের পছন্দ হত না।জিসানের বাসাতেই এটা নিয়ে নাকি ওদের মধ্যে প্রচন্ড ঝগড়া হয়েছিল।সেই রাতে তানিন জিসানকে কান্নাকাটি করে বলেছিল ‘তোর যে কোন একজনকে বেছে নিতে হবে হয় রাহাত না হয় আমি’। 😉

Advertisements
This entry was posted in রম্য. Bookmark the permalink.

24 Responses to বন্ধুত্ব, প্রেম এবং যুদ্ধ- ১

  1. Farin বলেছেন:

    তোমার লেখা ভাল লাগলো। লেখাটা পরে আমার বন্ধুদের কথা মনে পরে গেল।

  2. potherklanti বলেছেন:

    হাহা! মজা পাচ্ছিলাম শুরুতে, কিন্তু শেষ হল ঝগড়া দিয়ে:(

  3. বন্ধুদের মধ্যে বন্ধুকে নিয়ে এত কম্পিটিশন 😉
    অনেক দিন পরে আবার লিখলেন ভাবী। অনেক ভালো লাগল। পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় রইলাম 🙂

  4. স্মৃতিচারণমূলক লেখা এমনিতেই আমার খুব ভালো লাগে, তার উপর যদি হয় স্কুল, কলেজ বা ভার্সিটি লাইফের উপর, তাহলে তো কথাই নেই।
    সহজ, সরল ভাষায় সাবলীলভাবে লিখে গিয়েছেন আপনি। একটানে পড়ে ফেলার মতো। পড়ার পর মনে হলো আরেকটু বড়ো হলে ক্ষতি কী হতো?
    পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায়।
    ভালো থাকুন নিরন্তর।

  5. tusin বলেছেন:

    ভাবী……….অনেক দিন পর আপনার লেখা পেলাম………………….
    ভাল লাগল পড়ে……………তা কেমন আছেন…….???
    আর আপনাকে অগ্রীম ঈদের শুভেচ্ছে……………….
    ভাবী সালামি কিন্তু দিতে হবে…….:P:P

  6. ডিজে আরিফ বলেছেন:

    শুরুটা দারূণ হয়েছে… দেখা যাক পরবর্তী পর্বগুলোতে কি পাচ্ছি…

  7. জয় সরকার বলেছেন:

    লেখা তো বরাবরের মতই উপাদেয়!!! আপনি দেখি কম নাটের গুরু ছিলেননা স্টুডেন্ট লাইফে!! 😛

  8. বহুব্রীহি বলেছেন:

    বহুদিন পর 🙂

  9. potherklanti বলেছেন:

    সেই কতদিন গেল, আপনার লেখা নাই:(

  10. বন্ধুত্বের এমন অনেক স্মৃতিই আছে যেগুলো প্রায় সময়ই মনে পড়ে!

  11. সুপ্ত বলেছেন:

    “পুরনো সেই দিনের কথা” ……

  12. আপনি ভাল লিখেন, কিন্তু লেখা ছেড়ে দিয়েছেন মনে হচ্ছে। লিখুন, একদিন অনেক ভাল কিছু হয়ে যাবে। শুভেচ্ছা।

  13. afsarnizam বলেছেন:

    গপ্পটি ভালই লাগলো

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s